Saturday, October 30, 2004

ধর্ষণ বিষয়ে প্রারম্ভিক কথা - সেলিনা শিরীন শিকদার

"Rather than warning women to beware of strangers, you'd be better off looking at what we know and warning women to beware of those men closest to them." ('A Natural History of Rape')
আমি মনে করি যে কোনো বিষয় আলোচনার সময় পুরো বিষয় সংক্ষেপে ব্যাখ্যা না করে নিজের মতামত দিলে ভাবের যোগাযোগে সমস্যা হতে পারে । তেমনি মানবেতর প্রাণীদের অনেক আচরণ ভিত্তি করে মানব আচরণ ব্যাখ্যা করার প্রক্রিয়াটি সম্ভবত ভিন্ন, গিনিপিগ বা ইঁদুর বা বাঁদর এই অবস্থায় এই আচরণ করে, কাজেই ম্যামাল মানুষও এই একই আচরণ করবে-এভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভুল হবার সম্ভাবনাই বাড়ে। কারণ মনোবিজ্ঞান বলে প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র মানুষ .ব্যাশনাল বিং বা যুক্তিবাদী প্রাণী। উপরন্তু যার রয়েছে সাংস্কৃতিক চাহিদা। আর যে চাহিদা মানুষকে (দেখা যায়) অনেক মৌলিক প্রেষণা বা মটিভেশন থেকে নিবৃত্ত রাখে।
আমি মনে করি আলোচনার সময় আলোচ্য বিষয়ের একটি বা একাধিক সংজ্ঞা দেয়া ভালো। ধর্ষণ বলতে এখানে কী বুঝবো এবং কী আলোচনা হবে? যে কাউকে পরাস্ত করার বাসনা? চেষ্টা? যৌন নিপিড়ন? জাতিগত ভাবে অন্য জাতির উপর শক্তি দেখানো? রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক আধিপত্য? না কি অক্ষর সাজিয়ে একটি সভায় ভেঙচি কাটাকে আমরা ধর্ষণ বলবো? না কি আরো কয়টা সাথে নিয়ে এই সবগুলিকেই একই সংজ্ঞায় ব্যাখ্যা করবো?
যৌন নিপিড়ন যদি ধরি, তাহলে তার কোন দিক নিয়ে আলোচনা করবো? মনোবৈজ্ঞানিক দিক, আগ্রাসন ও ভায়োলেন্স, ক্রিমিনাল জাস্টিস, ফরেনসিক বিজ্ঞান, মানবাধিকার, জেন্ডার ইস্যু? ভিকটিমোলজি? মনোচিকিত্‌সা? না কি ভেজটেবল-খিচুরি আর আলু ভর্তা রান্না করার সময়ে মানুষের মাঝে ধর্ষকাম কাজ করে কি না তার একটি তুলনামুলক আলোচনা?
আমরা আলোচনা করে দেখতে পারি বাংলা সাহিত্যে ছোট গল্পে অথবা কবিতায় ধর্ষণ (যৌন নিপিড়ন) কী ভাবে চিত্রিত হয়েছে। এটা যে প্রতিরোধ করা যায়, এ সম্পর্কে যে গণসচেতনতা তৈরি করা সম্ভব এবং হচ্ছে সে সম্পর্কে বর্তমান লেখকদের কি কোনো গভীর পর্যবেক্ষণ এবং নিজেদের নিজস্ব কোনো দিক নিদের্শনা আছে কি না ? থাকলে তা কী রকম, না থাকলে কেন নেই। তাদের এই চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ কি সৃজনশীলভাবে তাদের লেখায় প্রতিফলিত হচ্ছে কি না। না কি আমাদের মনোভাবটা এমন-কোনো যে, এক গোষ্ঠিতে একটা ঘটনা দেখলাম আর মনের আনন্দে তার ডকুমেন্টশনের কাজ করে ফেললাম, - ব্যস আমি বেস্ট সেলর লেখক হয়ে গেলাম, আমার আর কোনো দায় নেই?
লেখকদের পেশাগত ও সামাজিক দায় থাকা কি জরুরী? এই দায়ের সাথে ধর্ষণের কী সম্পর্ক?
প্রায়ই একটা অভিযোগ শোনা যায় পশ্চিমাদেশে যে পনোর্গ্রাফির কারণে ধর্ষণের প্রবনতা বেশি (আমেরিকায় প্রতি মিনিটে একটি মেয়ে ধর্ষণ-এর স্বীকার হয়)। এটা নিয়ে অনেক আলাপ আলোচনা। কিন্তু পনোর্গ্রাফির চাহিদা এবং অর্থনৈতিক ভিত এতোই জোরালো যে চাইলেই এই বিষয়টা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া যাচ্ছে না। আমি প্রথম যখন বিষয়টা পড়ি তখন চুলে বিলি কেটে কেটে ভাবছিলাম সচেতন মেয়েরা পনোর্গ্রাফি লিখলে কেমন হয়। (এটা একটা স্টুপিড চিন্তা বা প্রশ্ন। কিন্তু আমি নিজেকে ও অন্যদের প্রায়ই এ রকম প্রশ্ন করি, কারণ নিউটনের মাথায় এর চেয়েও মারাত্মক একটা হাবা প্রশ্ন এসেছিলো - আপেল কেন গাছ থেকে মাটিতে পড়ে? এই হাবা প্রশ্নের একটি যুক্তিপূর্ণ উত্তর তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বলেই নিউটনকে আমরা স্মরণ করি এখনো। এই মাধ্যমটির ভেতর দিয়ে সমাজ-মানসে দীর্ঘমেয়াদী কোনো সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনা সম্ভব কি না। ভেবে দেখা যেতে পারে মেয়েরা এই চ্যালেঞ্জ নেবে কি না। না কি তারা অন্য ভাবে বিষয়টি ভাবছেন।
বিংশ শতকের শুরুর দিকে সাইকো থেরাপি নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়, কারণ মানবতাবাদী মনোবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা কার্ল রজারস প্রশ্ন করেছিলেন সাইকোথেরাপি কি আসলেই কাজ করে? করলেও পৃথিবীর সর্বত্র কি তা এক রকম? কাজেই প্রশ্ন আসে পরিমাপকের। পদার্থ বিজ্ঞানের মাপকে যা বাংলাদেশে ১ কেজি আমেরিকাতেও তাই এবং চীনদেশেও। এতে বিভিন্নতা দেখা যায় না। কিন্তু আমেরিকান একটি বুদ্ধি পরিমাপক দিয়ে বাংলাদেশের একজন বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধি পরিমাপ করলে ফলাফলে দেখা যেতে পারে যে মানুষটি বুদ্ধিহীন। তাহলে? মানুষের সংস্কৃতি এমনই একটি বিষয় যে তাকে পরিমাপকে/গবেষণায় একটি এক্সটারনাল ভেরিয়েবল বলে বিবেচনা করা বিপদজনক।
মসনবী শরিফের একটা গল্প বলি। দুগর্ম পাহাড়ী অঞ্চলে এক লোক মাটি খুড়ে কিছু পানি পেয়েছে, সেখানে তারা পানির অভাবে থাকে। পঁচা ময়লা ঘোলা পানি ঘরে এনে সে এতোই আপ্লুত যে কী করবে বুঝতে পারছে না। তার স্ত্রী বললো- চলো এ পানি বরং রাজাকে দেই, তিনি খুশি হবেন। ওরা রাজার কাছে গেলো এবং রাজা অত্যন্ত খুশি হলেন সে পানি পেয়ে। যে পাত্র ভরে পানি এনেছিলো ওরা, রাজা আদেশ দিলেন সে পাত্র ভরে ওদের সোনার মোহর দেবার জন্য। মহা আপ্যায়নের পর রাজা তার মন্ত্রীকে বললেন ওদের রাজধানীর সীমানা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসো। কিন্তু সাবধান, দেখো, কোনো ভাবেই ওরা যেন আমার নীল নদ দেখতে না পায়।